মণিপাল হাসপাতাল ঢাকুরিয়ার ডায়ালিসিস পেশেন্ট সামিট, কিডনি রোগীদের সচেতন, আত্মবিশ্বাসী ও স্বনির্ভর করে তুলতে এক বিশেষ উদ্যোগ



কলকাতা, ২৫শে জুলাই, ২০২৬: দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ (Chronic Kidney Disease বা CKD) বর্তমানে বিশ্বজুড়ে দ্রুত বাড়তে থাকা জনস্বাস্থ্য সমস্যাগুলির মধ্যে অন্যতম। দেরিতে রোগ নির্ণয় এবং সচেতনতার অভাবের কারণে এখনও হাজার হাজার মানুষকে আজীবন ডায়ালিসিসের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে কিডনি রোগীদের জন্য এক ছাদের নিচে সমন্বিত তথ্য, পরামর্শ এবং সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে মণিপাল হাসপাতাল ঢাকুরিয়া, মণিপাল ইনস্টিটিউট অব নেফ্রোলজি অ্যান্ড ইউরোলজি-র উদ্যোগে ডায়ালিসিস পেশেন্ট সামিট-এর আয়োজন করে। রোগীকেন্দ্রিক এই বিশেষ কর্মসূচিতে ৫০ জনেরও বেশি ডায়ালিসিস গ্রহণকারী রোগী, ডায়ালিসিসের অপেক্ষায় থাকা রোগী, কিডনি প্রতিস্থাপনপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং তাঁদের পরিচর্যাকারীরা অংশগ্রহণ করেন। অভিজ্ঞতা বিনিময়, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পারস্পরিক শেখার একটি কার্যকর মঞ্চ তৈরি করাই ছিল এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ডা. অর্ঘ্য মজুমদার, অ্যাডভাইজার ও সিনিয়র কনসালট্যান্ট, নেফ্রোলজি ও কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট বিভাগ এবং ডা. উপল সেনগুপ্ত, ডিরেক্টর ও ক্লিনিক্যাল লিড, নেফ্রোলজি ও কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট বিভাগ, মণিপাল হাসপাতাল ঢাকুরিয়া। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ডা. বাস্তব ঘোষ, কনসালট্যান্ট ইউরোলজিস্ট।
প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এরপর ‘কিডনি স্বাস্থ্য’ বিষয়ক একটি ইন্টারঅ্যাকটিভ প্যানেল আলোচনার আয়োজন করা হয়, যেখানে চিকিৎসকরা কিডনি রোগ সম্পর্কে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা দূর করেন, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয়ের গুরুত্ব তুলে ধরেন, ডায়ালিসিস ও কিডনি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক অগ্রগতির বিষয়ে আলোচনা করেন এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, সুষম পুষ্টি এবং চিকিৎসকের পরামর্শ যথাযথভাবে মেনে চলার গুরুত্বও তুলে ধরা হয়।
রোগীদের ব্যক্তিগতভাবে পরামর্শ দেওয়ার উদ্দেশ্যে ডায়েটেটিক্স, ফিজিওথেরাপি, সাইকোলজি, ডায়ালিসিস সার্ভিসেস এবং পেরিটোনিয়াল ডায়ালিসিস বিভাগের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে পৃথক ইন্টারঅ্যাকশন কিয়স্ক স্থাপন করা হয়। সেখানে উপস্থিত রোগী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা সরাসরি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে নিজেদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন এবং তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী সমন্বিত পরামর্শ গ্রহণ করেন।
অনুষ্ঠানকে আরও মানবিক ও অনুপ্রেরণামূলক করে তুলতে একটি প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা-রও আয়োজন করা হয়, যেখানে রোগীরা তাঁদের চিকিৎসাজীবনের সংগ্রাম, আশা এবং দৃঢ় মনোবলের গল্প তুলে ধরেন। শান্তনু চ্যাটার্জী, সুশান্ত গাঙ্গুলি, পরশ শর্মা, প্রজেশ কুমার ঘোষ, মালয়া তালপাত্র, সার্থক দাস এবং ডা. কাবেরী চৌধুরী-কে তাঁদের সাহস, অধ্যবসায় এবং জীবনসংগ্রামের স্বীকৃতিস্বরূপ উপস্থিত চিকিৎসকদের হাতে পুরস্কার প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ডা. অর্ঘ্য মজুমদার, অ্যাডভাইজার ও সিনিয়র কনসালট্যান্ট, নেফ্রোলজি ও কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট বিভাগ, বলেন,”দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের ক্রমবর্ধমান বোঝার পরিপ্রেক্ষিতে রোগীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ এখন অত্যন্ত জরুরি। একজন রোগী যখন কিডনি রোগের শেষ পর্যায়ে (End-Stage Renal Disease) পৌঁছে যান, তখন তাঁর জীবন অত্যন্ত দুর্বিষহ হয়ে ওঠে এবং তিনি দৈনন্দিন কাজকর্মে অনেকটাই অক্ষম হয়ে পড়েন। ডায়ালিসিস বা রেনাল রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি শুধুমাত্র একটি চিকিৎসা পদ্ধতি নয়, এটি এমন এক জীবন-পরিবর্তনকারী যাত্রা, যা রোগীর শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে এবং তাঁকে নতুনভাবে জীবনযাপনের সুযোগ করে দেয়। এই সামিটের মাধ্যমে আমরা এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে চেয়েছি, যেখানে রোগীরা সহজেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন, নির্দ্বিধায় তাঁদের প্রশ্নের উত্তর জানতে পারবেন, চিকিৎসকদের পাশাপাশি অন্যান্য রোগীর অভিজ্ঞতা থেকেও শিক্ষা নিতে পারবেন এবং বুঝতে পারবেন যে সময়মতো ও নিয়মিত চিকিৎসা, সঠিক পুষ্টি এবং চিকিৎসকের পরামর্শ যথাযথভাবে মেনে চললে তাঁরাও একটি সুস্থ, অর্থবহ ও পরিপূর্ণ জীবনযাপন করতে সক্ষম।”
ডা. উপল সেনগুপ্ত, ডিরেক্টর ও ক্লিনিক্যাল লিড, নেফ্রোলজি ও কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট বিভাগ, বলেন,”ভারতে প্রতিবছর দুই লক্ষেরও বেশি মানুষ কিডনির শেষ পর্যায়ের রোগে (End-Stage Kidney Disease) আক্রান্ত হন। তাই সময়মতো চিকিৎসা এবং কিডনি প্রতিস্থাপন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যেসব রোগী কিডনি প্রতিস্থাপনের উপযুক্ত, তাঁদের জন্য এটি দীর্ঘমেয়াদে উন্নত জীবনযাপন এবং ডায়ালিসিসের তুলনায় অনেক ভালো মানের জীবন নিশ্চিত করতে পারে। কিন্তু নানা ভ্রান্ত ধারণা এবং সচেতনতার অভাবের কারণে অনেকেই সঠিক সময়ে এই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। এই ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা রোগীদের সচেতন করতে, ভুল ধারণা দূর করতে এবং কিডনি প্রতিস্থাপন নিয়ে তথ্যভিত্তিক আলোচনা উৎসাহিত করতে চাই। একই সঙ্গে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় এবং নিয়মিত কিডনি স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর গুরুত্বও তুলে ধরতে চাই।”
সামিটে নিজের অনুপ্রেরণাদায়ক অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন ৫২ বছর বয়সি ব্যারাকপুরের বাসিন্দা এবং সরকারি কর্মচারী শ্রী অরূপ কুমার দাস, যিনি একজন কিডনি প্রতিস্থাপনপ্রাপ্ত রোগী। তিনি বলেন,”২০০৭ সালে যখন জানতে পারি যে আমার কিডনি বিকল হয়েছে, তখন আমার জীবন যেন এক মুহূর্তে বদলে যায়। মনে হয়েছিল সবকিছু শেষ হয়ে গেছে এবং আর কোনোদিন কাজ করতে পারব না। এরপর আমার ডায়ালিসিস শুরু হয়। প্রায় এক বছর ডায়ালিসিস নেওয়ার পর ২০০৮ সালের জুন মাসে আমার কিডনি প্রতিস্থাপন হয়। গত ১৮ বছর ধরে আমি সম্পূর্ণ সুস্থ ও সক্রিয় জীবনযাপন করছি। এখনও পূর্ণসময়ের কাজ করছি, কাজের সূত্রে নিয়মিত ভ্রমণ করছি এবং পরিবারের সঙ্গে প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করছি। কয়েক বছর আগে আমি একজন গর্বিত বাবাও হয়েছি। আমার অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে, চিকিৎসকের পরামর্শ কঠোরভাবে মেনে চলা, পরিবারের সমর্থন এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার মাধ্যমে কিডনি প্রতিস্থাপন সত্যিই একজন মানুষকে নতুন জীবন উপহার দিতে পারে। আমার এই যাত্রাপথে পাশে থাকার জন্য এবং আমাকে জীবনের দ্বিতীয় সুযোগ করে দেওয়ার জন্য আমি ডা. অর্ঘ্য মজুমদারের কাছে আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।”
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সিনিয়র অ্যাডভোকেট শ্রী প্রদ্যুম্ন সিনহা বলেন,”ডা. উপল সেনগুপ্তের সঙ্গে পরিচয়ের পর আমি কখনও নিজেকে রোগী বলে মনে করিনি। তিনি আমাকে জীবনের দ্বিতীয় সুযোগ দিয়েছেন। কিডনি প্রতিস্থাপনের পর আমি স্বাভাবিক জীবনযাপন করছি, আমার পেশাগত কাজও আগের মতোই চালিয়ে যেতে পারছি এবং বড় অস্ত্রোপচার নিয়ে যে ভয় ছিল, তা কাটিয়ে উঠতে পেরেছি। মণিপাল হাসপাতালের এই উদ্যোগ মানুষকে ডায়ালিসিস ও কিডনি প্রতিস্থাপন সম্পর্কে সচেতন করেছে, অযথা ভয় দূর করেছে এবং সুস্থ জীবনযাপনের গুরুত্ব বুঝিয়েছে। রোগীদের অবশ্যই সময়মতো ওষুধ খেতে হবে এবং চিকিৎসকদের সমস্ত নির্দেশ যথাযথভাবে মেনে চলতে হবে।”
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মণিপাল হাসপাতাল ঢাকুরিয়ার হাসপাতাল ডিরেক্টর শ্রী দিলীপ কুমার রায় বলেন,”কিডনি রোগের নির্ণয় শুধু একজন রোগীকেই নয়, তাঁর পুরো পরিবারকেই মানসিকভাবে প্রভাবিত করে। চিকিৎসকরা চিকিৎসা দেন ঠিকই, কিন্তু প্রকৃত আরোগ্য আসে সচেতনতা, মানসিক সমর্থন এবং এই বিশ্বাস থেকে যে রোগীরা তাঁদের এই লড়াইয়ে একা নন। ডায়ালিসিস পেশেন্ট সামিটের মাধ্যমে আমরা এমন একটি মঞ্চ তৈরি করতে চেয়েছি, যেখানে রোগীরা নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে পারবেন, অন্যদের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পাবেন এবং একে অপরের শক্তির উৎস হয়ে উঠবেন। মণিপাল হাসপাতাল ঢাকুরিয়ায় আমাদের দায়বদ্ধতা শুধু উন্নত চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; আমরা রোগীদের জীবনের প্রতিটি ধাপে তাঁদের পাশে থাকতে চাই, যাতে তাঁরা আশা, আত্মবিশ্বাস এবং মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারেন।”
সামিটের শেষ পর্বে একটি উন্মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে রোগী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করেন, বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর পান এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন। এই অভিনব উদ্যোগের মাধ্যমে মণিপাল হাসপাতাল ঢাকুরিয়া আবারও কিডনি স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, সময়মতো চিকিৎসার গুরুত্ব তুলে ধরা এবং রোগীদের আরও সুস্থ, আত্মবিশ্বাসী ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনে সক্ষম করে তোলার প্রতি তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *