বিরল জন্মগত চোখের ত্রুটিজনিত কয়েক দশকের দৃষ্টিসমস্যার অবসান, ৫১বছর বয়সি এক ব্যক্তির দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিল ডা. আগরওয়ালস আই হসপিটাল



কলকাতা, ৭জুলাই ২০২৬: জন্মগত আইরিস কোলোবোমা (কনজেনিটাল আইরিস কোলোবোমা)-এর কারণে শৈশব থেকেই বাঁ-চোখে দুর্বল দৃষ্টিশক্তি নিয়ে জীবন কাটানো 51 বছর বয়সি এক রোগী, ডা. আগরওয়ালস আই হসপিটাল (কলকাতা)-এ একাধিক ডে-কেয়ার পদ্ধতিতে চিকিৎসার পরে পুনরায় কার্যকর দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছেন। আইরিস কোলোবোমা একটি বিরল জন্মগত ত্রুটি, যেখানে চোখের আইরিসের একটি অংশ সম্পূর্ণভাবে বিকশিত হতে পারে না। চিকিৎসার অংশ হিসেবে রোগীর উপর সিঙ্গল-পাস ফোর-থ্রো (এসএফটি) পিউপিলোপ্লাস্টি করা হয়, যা ডা. আগরওয়ালস আই হসপিটালের চেয়ারম্যান প্রফেসর অমর আগরওয়ালের চিন্তাপ্রসূত একটি আইরিস পুনর্গঠন পদ্ধতি। এই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অস্বাভাবিক পিউপিলের গঠন সংশোধন করা সম্ভব, একইসঙ্গে দৃষ্টিশক্তি ও দেখার গুণমান—উভয়েরই উন্নতি ঘটানো সম্ভব হয়। চিকিৎসার পরে রোগীর বাঁ-চোখের দৃষ্টিশক্তি 40%-এরও কম থেকে বেড়ে 75%-এ পৌঁছেছে।
বছরের পর বছর ধরে রোগী একাধিক শীর্ষস্থানীয় হাসপাতালে পরামর্শ নিয়েছিলেন। তবে চিকিৎসকেরা তাঁর সমস্যাকে অত্যন্ত জটিল বলে উল্লেখ করেন এবং অস্ত্রোপচারের পর দৃষ্টিশক্তি কতটা ফিরবে, সে বিষয়ে অনিশ্চয়তার কথা জানান। জন্মগত আইরিস কোলোবোমার পাশাপাশি রোগীর চোখের সামনের (অ্যান্টেরিয়র সেগমেন্ট) এবং পিছনের (পোস্টেরিয়র সেগমেন্ট) উভয় অংশেই জটিলতা ছিল, যা লেন্স ও রেটিনাকে প্রভাবিত করেছিল। তাঁর ফ্যাকোডোনেসিস ছিল, অর্থাৎ লেন্সকে ধরে রাখা কাঠামো দুর্বল হয়ে যাওয়ায় লেন্স অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছিল। পাশাপাশি তাঁর জোনুলোপ্যাথি ছিল, যেখানে লেন্সকে স্থির অবস্থায় ধরে রাখার ক্ষেত্রে যে সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম তন্তু বা জোনিউলস থাকে তা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ে। এসব জটিলতার ফলে তাঁর অ্যাম্ব্লাইওপিয়া (লেজি আই) দেখা দেয়। এটি এমন একটি অবস্থা, যেখানে শৈশবে আক্রান্ত চোখ থেকে মস্তিষ্কে স্পষ্ট ছবি না পৌঁছানোর কারণে দৃষ্টিশক্তির স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এছাড়া, চল্লিশের গোড়ার দিকেই তাঁর দুই চোখেই প্রাথমিক পর্যায়ের ছানি (আর্লি ক্যাটারাক্ট) দেখা দেয়, যা দৃষ্টিশক্তিকে আরও খারাপ করে তোলে।
জন্মগত আইরিস কোলোবোমা, জোনিউলসের দুর্বলতা, রেটিনার জটিলতা এবং অ্যাম্ব্লাইওপিয়া—এই সবকিছুর সমন্বয়ে অস্ত্রোপচারটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হয়ে ওঠে…একথা বলাই বাহুল্য। পর্যাপ্ত জোনিউলার সাপোর্ট না থাকায় ছানি অপসারণের পর ইন্ট্রাঅকুলার লেন্স (আইওএল) প্রতিস্থাপন করাও ছিল প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত কঠিন বিষয়। কারণ, স্থিতিশীল সাপোর্টের অভাবে অ্যাফাকিয়া হওয়ার উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি ছিল, অর্থাৎ এমন একটি অবস্থা যেখানে চোখে স্বাভাবিক বা কৃত্রিম—কোনও লেন্সই থাকে না। এর ফলে অস্ত্রোপচারের জটিলতা আরও বেড়ে যায়। এছাড়া, কলকাতায় এসএফটি পিউপিলোপ্লাস্টি করার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চক্ষু শল্যচিকিৎসকের সংখ্যাও খুবই সীমিত ছিল। ফলে কোনও হাসপাতালই রোগীর চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে রাজি হয়নি।
তবে ডা. সমর সেনগুপ্ত, স্পেশালিস্ট অপথ্যালমোলজিস্টের নেতৃত্বাধীন সার্জিক্যাল টিম সফলভাবে এই জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করে রোগীর বাঁ-চোখে কার্যকর দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়। একইসঙ্গে দলটি স্ট্যান্ডার্ড ফ্যাকোইমালসিফিকেশন পদ্ধতিতে ছানির অস্ত্রোপচারও করে। যেহেতু দুর্বল জোনিউলসের কারণে রোগীর ক্যাপসুলার ব্যাগ স্থিতিশীল ছিল না, তাই সেখানে একটি ক্যাপসুলার টেনশন রিং (সিটিআর) প্রতিস্থাপন করা হয়। এটি একটি নমনীয় ডিভাইস, যা ক্যাপসুলার ব্যাগকে স্থিতিশীল রাখে এবং নিরাপদভাবে ইন্ট্রাঅকুলার লেন্স (আইওএল) প্রতিস্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সাপোর্ট প্রদান করে।
এই বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে ডা. সমর সেনগুপ্ত বলেন, “রোগী প্রথমে তাঁর ডান চোখের ছানির অস্ত্রোপচারের জন্য আমাদের কাছে আসেন। অস্ত্রোপচারটি সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পরে তিনি তাঁর অত্যধিক জটিল বাঁ-চোখের চিকিৎসা করানোর বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী হন। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তিনি বিশ্বাস করতেন যে, তাঁর বাঁ-চোখের দৃষ্টিশক্তি আর কখনও ফিরবে না, কারণ অন্যত্র তাঁকে জানানো হয়েছিল যে অস্ত্রোপচার হয় সম্ভব নয়, নয়তো করলেও দৃষ্টিশক্তির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে না। বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরে আমরা তাঁর চোখে থাকা একাধিক জটিলতা বিবেচনা করে একটি কাস্টমাইজড অস্ত্রোপচার পরিকল্পনা তৈরি করি। বর্তমানে তিনি তাঁর বাঁ-চোখে কার্যকর দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছেন, দৈনন্দিন কাজকর্ম স্বাধীনভাবে করতে পারছেন এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে এসেছেন। এমন জটিল ক্ষেত্রে রোগীদের দৃষ্টিশক্তি ও আত্মবিশ্বাস—উভয়ই ফিরিয়ে দেওয়ার মতো বিষয়টি আমাদের গোটা টিমের কাছেই অত্যন্ত সন্তোষজনক।”
চক্ষু পরিষেবায় উৎকর্ষের 10 বছর পূর্তি উদ্‌যাপন করছে ডা. আগরওয়ালস আই হসপিটাল, কলকাতা। এই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি ধারাবাহিকভাবে বহু জটিল ও চ্যালেঞ্জিং রোগীর সফল চিকিৎসা করেছে। এই মাইলফলক উদ্‌যাপনে উপস্থিত ছিলেন পদ্মশ্রী ঊষা উত্থুপ, যিনি অনুষ্ঠানের মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। হাসপাতালের সাম্প্রতিক সাফল্যের অন্যতম উদাহরণ 45 বছর বয়সি এক গৃহবধূ, যিনি উভয় চোখেই বাইল্যাটারাল হাই মায়োপিয়া (–10.00 ডায়োপ্টারের বেশি) এবং চোখের অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘ অ্যাক্সিয়াল লেংথ-এ ভুগছিলেন। এর ফলে দূরের জিনিস অত্যন্ত ঝাপসা দেখতেন। কয়েক দশক ধরে তাঁকে মোটা পাওয়ারের চশমার ওপর নির্ভর করতে হতো, কনট্যাক্ট লেন্সও ব্যবহার করতে পারতেন না এবং দৈনন্দিন কাজকর্ম মারাত্মকভাবে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। তাঁর ক্ষেত্রে প্রচলিত লেজার ভিশন কারেকশন (ল্যাসিক) সম্ভব ছিল না, কারণ এত বেশি রিফ্র্যাকটিভ পাওয়ারের ক্ষেত্রে নিরাপদে লেজার চিকিৎসা করার জন্য তাঁর কর্নিয়া যথেষ্ট পুরু ছিল না।
ডা. আগরওয়ালস আই হসপিটাল, কলকাতার হেড – ক্লিনিক্যাল সার্ভিসেস ডা. তনুশ্রী চট্টোপাধ্যায়-এর নেতৃত্বাধীন সার্জিক্যাল টিম পর্যায়ক্রমে উভয় চোখে রিফ্র্যাকটিভ লেন্স এক্সচেঞ্জ অস্ত্রোপচার করে এবং প্রিমিয়াম মাল্টিফোকাল/এক্সটেন্ডেড ডেপথ-অব-ফোকাস (ইডিওএফ) ইন্ট্রাঅকুলার লেন্স প্রতিস্থাপন করে। এই আধুনিক দৃষ্টিশক্তি সংশোধন পদ্ধতিতে 3 mm-এরও কম দৈর্ঘ্যের একটি ক্ষুদ্র চির বা ছিদ্রের মাধ্যমে চোখের স্বচ্ছ প্রাকৃতিক লেন্সটি অপসারণ করে তার পরিবর্তে রোগীর জন্য উপযোগী একটি কাস্টমাইজড কৃত্রিম লেন্স প্রতিস্থাপন করা হয়, যা স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি সংশোধন করে। অস্ত্রোপচারের পর রোগীর দুই চোখেরই চশমা ছাড়া দৃষ্টিশক্তির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয় এবং কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো তিনি চশমামুক্ত জীবন ফিরে পান।
মিডিয়া যোগাযোগ: মহেশ কুমার @ 98845 45000

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *