লাল পলাশের পদাবলী

সুবল সরদার

পলাশ মানে বসন্তের সমারোহ, পলাশ মানে ফাগুন হাওয়া ,পলাশ মানে হোলি রঙের ছয়লাপ,পলাশ মানে অনুরাগের ছোঁয়া । শিউলির গন্ধ ,পলাশের বর্ণ দু’জন দু’জনকে টেক্বা দেয়। তবুও হার মানতে হয় শিউলির কাছে, যদিও দু’জনেই রূপ -বর্ণে- গন্ধে জগৎ সেরা। মহুয়ার মাদকতাও পারে না তাকে ছাপিয়ে যেতে !পলাশ ভার্সেস শিউলি না বলে- বলা ভাল লাল ভার্সেস সাদা । প্রথম জনের প্রকাশ শরতে , পরিচয় শিশিরে ভিজে। দ্বিতীয় জনের প্রকাশ বসন্তে, পরিচয় ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায়। একজনের স্থান মন্দিরে -সব দেবতা চরণে,অন্যজন শুধু পলাশ প্রিয়ার অর্থাৎ দেবী সরস্বতীর চরণে। কেউ ভাগ্য বলে দেবতার আশীর্বাদ পায় ,কেউ কপাল দোষে দেবতার আশীর্বাদ থেকে বঞ্চিত হয় । একজনের স্থান কবিতায়,গানে, সাহিত্যে ,অন্যজনের স্থান কেবল ফাগুন হাওয়ায় । একজন চির দিনের গান, অন্যজন তখন বসন্তের গানবিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কবিতায়, গানে নানাভাবে শিউলি ফুলের কথা উল্লেখ করেছেন ।সেদিন তিনি দুলে ছিলেন ফুল ডোরে ।কেন যে তিনি পলাশ বনে দোলেননি জানা যায় না। পলাশের সৌন্দর্য তাঁকে কী রোমাঞ্চিত করতে পারেনি ? পলাশের রাগের শোভা তাঁর কী মন টানেনি? লাল পলাশের নেশা কেন তাঁর চোখের বাইরে থেকে গেলে বোঝা যায় না । নামী আর অনামীর এখানে তফাৎ করে। অনামিকাও কবির হাতে পড়ে কবিতা হয়ে যায় আর কারুর সব সম্ভবনা থাকা সত্ত্বেও ঝরে যায় পলাশের মতো একরাশ অভিমান নিয়ে,বিরহী হয়ে ।একজন প্রেমের প্রতীক হতে পারে, অন্যজন কখনো প্রেমের প্রতীক হতে পারে না । সে চির প্রেমিক কিন্তু তার কপালে প্রেম নেই। তার সব আছে। রূপে- বর্ণে -গন্ধে সবার উপরে কিন্তু সে সবার নজরের বাইরে। তাকে কর্ণের মতো চির ট্রাজিক হিরো বলে মনে হয়। একজন শান্ত ,শিষ্ট শরৎচন্দ্রের পার্বতী হলে, অন্যজন হবে উচ্ছৃঙ্খল দেবদাস। পলাশ মানে শুধু ব্যথা, বিরহ গাঁথা, শিউলি মানে শুধু ভালোবাসা, অনুরাগের ছোঁয়া।পলাশ মানে পুরুলিয়া -বসন্ত -হোলি রূপালী লালের মায়াময় জগৎ। বনরাজীতে লাল পলাশের উৎসব লাগে। লাল মাটিতে লাল পলাশের হাট বসে । পাহাড়ের নেশায় কেউ ছোটে ,কেউ নদীতে ,কেউবা ঝর্ণা দেখতে, আমি ছুটি লাল মাটির দেশে লাল পলাশের অভিসারে । চোখের আলোয় লালের শোভা ! এতো রূপের বাহারে পলাশের রক্তিম রাগে সূর্যের রঙও ফিকে হয়ে যায় । চোখে নেশা লাগে । পলাশের রাগে মন অনুরাগী হয়ে ওঠে। পৃথিবী তখন মাতাল হয়ে ওঠে। আমাদের ভালোবাসার সব রঙ লেগে থাকে পলাশের রঞ্জিত প্রতিটা পাপড়িতে ,মন ভোলা ওই পলাশ ফুলের দেশে। সবুজ বন রাশি শুধু লালে লাল হয়ে ওঠে পলাশ বনে মনে হয় হোলি খেলে রক্ত বর্ণ হয়ে উঠেছে। হোলির মতো লালে লালে বসন্ত রাঙিয়ে ওঠে পলাশ রঙে । রজনী গন্ধা যদি নাইট কুঈন হয় পলাশকে রেড কিং বলে ছোট করা যাবে না। বসন্তে পলাশের রাজ্যাভিষেক ঘটে আমাদের রুপসী বাংলায় । লাল মাটির দেশের পলাশ ফুল কিভাবে বাংলার মন জয় করে! শিউলির সুরোভিত সোহাগে খুঁজে পাওয়া যায় পলাশের পুলোকিত রাগ। পলাশের পুলোকিত রাগ কী শিউলির সুরোভিত সোহাগ!শরৎ আসুক বা না আসুক, শিউলি ফুটুক বা না ফুটুক : বসন্ত আসুক, পলাশ ফুটুক ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় ,যৌবনের দূত হয়ে নব বসন্তে । বসন্ত হারিয়ে যায় পলাশ বনে। পলাশ বন বসন্তের সঙ্গে লুকোচুরি খেলে। পলাশ বসন্তের আগমনী। লাল পলাশের পদাবলী একেই বলে যা সৌন্দর্যের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ বলা যায়,যা প্রতিক্ষণে ক্ষণে পাপড়ির প্রতি রাগানুরাগে ঈশ্বরের মহিমা প্রকাশ করে। ঈশ্বরের কী অসীম কৃপা! তার সমস্ত ভালোবাসা বসন্তের পলাশ হয়ে ফোটে! লাল পলাশ মনে হয় লাল ফুলের রূপশালী মহাকাব্য।পলাশের রাগে কার না ভালো লাগে !ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় পুলক জাগে ।পুলকে -সোহাগে পৃথিবীতে দোল লাগে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *