ভারতের ১১,০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলজুড়ে আসন্ন জলবায়ু ঝুঁকি নিয়ে সংকটের মুখোমুখি জীবনযাত্রা জীবিকা 

কলকাতা, ১৯ জুন, ২০২৬: বেঙ্গালুরুর আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত ‘ইন্ডিয়ান কোস্টাল রিজিয়ন: ক্লাইমেট প্রজেকশনস ২০২১–২০৪০’ (Indian Coastal Region: Climate Projections 2021–2040) শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের উপকূলীয় অঞ্চলগুলো এমন এক আসন্ন জলবায়ু সংকটের মুখোমুখি যা আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই মানুষের জীবনযাত্রা, জীবিকা এবং বাস্তুতন্ত্রকে আমূল বদলে দেবে।
অল্প মেয়াদী পূর্বাভাসের (২০২১-২০৪০) ওপর গুরুত্ব দিয়ে পরিচালিত এই গবেষণায় নীতি-নির্ধারক ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের উপযোগী তথ্য ও বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণার নির্ভুলতা বাড়াতে এতে আঞ্চলিক তারতম্য বা ‘বায়াস’ (bias) সংশোধন করে CMIP6* মডেলের পূর্বাভাস ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার বা অভিযোজনের সুযোগ দ্রুত কমে আসছে; কারণ অদূর ভবিষ্যতে ভারতের বিভিন্ন প্রশাসনিক অঞ্চলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির সীমা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
আজিম প্রেমজি ফাউন্ডেশনের সিইও অনুরাগ বেহার বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন কোনো সুদূর ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ নয়—এটি বর্তমানের বাস্তবতা। ২০৪০ সাল আসতে আর মাত্র ১৪ বছর বাকি।” তিনি আরও বলেন, “এই ডেটা-সেটটি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে অনেক বেশি প্রত্যক্ষ ও জরুরি বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছে। এটি আমাদের অবকাঠামো ও শাসনব্যবস্থাকে এমনভাবে ঢেলে সাজানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়, যাতে আমরা সম্মিলিতভাবে এই সংকট মোকাবিলা করতে পারি।”
প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে কীভাবে বিভিন্ন সুনির্দিষ্ট পরিবর্তন—যেমন কেরালায় ‘ওয়েট-বাল্ব’ তাপমাত্রা (wet-bulb temperature) বৃদ্ধি থেকে শুরু করে মহারাষ্ট্রে বর্ষাকালের তীব্রতা বৃদ্ধি—প্রথাগত জ্ঞানভাণ্ডার বা স্থানীয় প্রথাগুলোকে (যেমন ‘নকাইহ’ বায়ু-পঞ্জিকা বা Nakaih wind calendar) অকার্যকর ও অবিশ্বস্ত করে তুলছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ যাতে জেলা পর্যায়ে জলবায়ু-সহনশীলতা গড়ে তুলতে পারে, তার জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক তথ্য ও উপাত্ত সরবরাহ করাই এই প্রতিবেদনের লক্ষ্য। “এই প্রতিবেদনের তথ্য এমন এক বাস্তবতাকে তুলে ধরে যা উপেক্ষা করার মতো বিলাসিতা আমাদের আর নেই। কয়েক দশক ধরে আমরা জলবায়ু পরিবর্তনকে একটি বৈশ্বিক ও বিমূর্ত বিষয় হিসেবে দেখেছি—যা মূলত মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাওয়া বা সুদূর ভবিষ্যতের কোনো সমস্যা বলে মনে করা হতো। কিন্তু আমাদের গবেষণার ফলাফল বলছে যে, ভারতের উপকূলীয় অঞ্চলের ক্ষেত্রে এই সংকট অত্যন্ত স্থানীয় এবং তাৎক্ষণিক। এর্নাকুলামের তীব্র তাপপ্রবাহ হোক কিংবা সুন্দরবনে বেড়ে চলা লবণাক্ততা—আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই ঝুঁকির বিষয়টি স্পষ্ট। পরিস্থিতি মোকাবিলার ক্ষেত্রে কেবল প্রতিক্রিয়াশীল পদক্ষেপের ওপর নির্ভর না করে আমাদের এখন সক্রিয় অভিযোজনের পথে এগোতে হবে; এমন এক ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে হবে যা আমাদের দেশের পরিবেশগত চ্যালেঞ্জগুলোকে স্বীকার করে ও মোকাবিলা করে,” বলেছেন আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্কুল অফ ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি’-র অধিকর্তা হারিনি নগেন্দ্র।
পশ্চিমবঙ্গের উপকূলীয় অঞ্চলগুলো পরিবেশগত পরিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও পূর্ব মেদিনীপুরের মতো জেলাগুলোতে গ্রীষ্মকালীন সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ১.০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা তাপ-সহনশীল পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি ঋতুভিত্তিক বৃষ্টিপাতের ধরনেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে; যেমন, পূর্ব মেদিনীপুরে উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বৃষ্টিপাত ১১% পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই পরিবর্তনগুলো সুন্দরবনের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করছে; সেখানে প্রায়শই বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ফলে ভূগর্ভস্থ জলে লবণাক্ততার মাত্রা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে গেছে, যা কৃষি ও জনস্বাস্থ্য—উভয়ের ওপরই বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এর মোকাবিলায় স্থানীয় জনগোষ্ঠী অভিযোজনের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে; বিশেষ করে নারীদের নেতৃত্বে ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা উপকূলীয় ভাঙন রোধে এক গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে। ২০৪০ সাল পর্যন্ত সময়সীমাকে সামনে রেখে তৈরি এই প্রতিবেদনটি এমন সব বিস্তারিত তথ্য ও উপাত্ত প্রদান করে, যা এই ভঙ্গুর বদ্বীপীয় বাস্তুতন্ত্র এবং এর ওপর নির্ভরশীল লক্ষ লক্ষ মানুষকে রক্ষায় অপরিহার্য।

মূল ফলাফলসমূহ
• তাপমাত্রা বৃদ্ধি: ভারতের গড় তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে; এর মধ্যে প্রায় ৪০টি উপকূলীয় জেলায় গ্রীষ্মকালীন তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
• বিপজ্জনক ‘ওয়েট-বাল্ব’ (Wet-Bulb) তাপমাত্রা: কেরালা ও তামিলনাড়ুর উপকূলীয় অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে উচ্চ ‘ওয়েট-বাল্ব’ তাপমাত্রা অনুভূত হবে, যা ৩১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে—মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য এই মাত্রাকে বিপজ্জনক বলে গণ্য করা হয়।
• এর্নাকুলামে তাপমাত্রার তীব্র বৃদ্ধি: সমস্ত উপকূলীয় জেলার মধ্যে এর্নাকুলামেই গ্রীষ্মকালীন সর্বোচ্চ তাপমাত্রার সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি (+১.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস) রেকর্ড করা হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। • পশ্চিম উপকূলে তীব্র মৌসুমি বৃষ্টিপাত: মহারাষ্ট্র ও গুজরাটের উপকূলীয় অঞ্চলে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি বৃষ্টিপাত হবে; বিশেষ করে মুম্বাইয়ের শহরতলিতে প্রায় এক সপ্তাহ অতিরিক্ত সময় ধরে ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে।
• সুরাটে মৌসুমি বৃষ্টির প্রকোপ: ঐতিহাসিকভাবে রেকর্ড করা মাত্রার তুলনায় সুরাটে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ২৩% বৃদ্ধি পাওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে।
• সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও ভাঙন: মাঝারি মাত্রার কার্বন নিঃসরণ পরিস্থিতির (SSP2-4.5)** আওতায়, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে উপকূলীয় ভাঙন ত্বরান্বিত হবে এবং ওড়িশার গঞ্জাম-এর মতো অঞ্চলে ‘ঘোস্ট ভিলেজ’ বা জনশূন্য পরিত্যক্ত গ্রামের সৃষ্টি হবে।
• ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি: সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় (প্রতি দশকে ০.২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস) তীব্র ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির সম্ভাবনা বেড়ে যাচ্ছে।
• ঐতিহ্যবাহী জীবিকার ওপর প্রভাব: গোয়ায় অসময়ে বৃষ্টিপাতের ফলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সম্পূর্ণ লবণ উৎপাদন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে; অন্যদিকে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে মাছ উপকূল থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, যার ফলে ক্ষুদ্র পরিসরে মাছ শিকারিরা খালি জাল নিয়ে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন।
• স্বাস্থ্য ও লবণাক্ততা: সুন্দরবন এলাকায় ঘন ঘন বাঁধ ভেঙে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ার সাথে নারীদের চর্মরোগ বৃদ্ধি এবং ঋতুস্রাব-সংক্রান্ত স্বাস্থ্যগত জটিলতার যোগসূত্র পাওয়া গেছে।
আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *