আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস

সুবল সরদার

মা -বাংলা- বাংলা ভাষা তিনটি শব্দের ভিন্ন অর্থ হলেও তিনটি ভাবগত দিয়ে এক এবং সমার্থক । মায়ের ভাষা বাংলা ভাষা বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় “মাতৃ দুগ্ধের” মতো। বাংলা ভাষা আমাদের হৃদয়ের ভাষা, কবিতার ভাষা, প্রেমের ভাষা। এই প্রাণের ভাষাকে কে ভুলে থাকতে পারে ? নির্বাসিতা লেখিকা তসলিমা নাসরিন হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারেন বাংলা ছেড়ে বাংলা ভাষা ভুলে বিদেশে নির্বাসন থাকার দুঃখ যন্ত্রণা ভাষা হারা মা হারা শিশুর মতো। সমুদ্রের মতো বোবার মনে গভীর দুঃখ লুকিয়ে থাকে। রূপে -রসে- গন্ধে- বর্ণে ভরা পৃথিবীতে সেই কেবল ভাষা হারা। লেখক মুল্ক রাজ আনন্দের ‘দ্য লষ্ট চাইল্ড ‘মতো ” I want only my my mother tongue. I want only my mother tongue . I want only my mother tongue .” মা হারা সেই শিশুর হৃদয় বিদারক কান্নার মতো বাংলা ভাষার জন্যে আমাদের হৃদয় কেঁদে ওঠে যদি কখনো কেউ আমাদের মুখের ভাষা কেড়ে নেয়।
বসন্তের মতো বাংলা ভাষা পলাশ শিমুলের রাগে আমাদের বাংলায় রূপশালী বাংলার কবিতা হয়ে ওঠে । বাংলা ভাষা সবুজ পাতার মতো চির বসন্ত প্রাণে বাজায় বাঁশি । বসন্তের দখিণা বাতাসের মতো আজ ‘আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস’ আসে ধানসিঁড়ি নদীর কবিতা শুনিয়ে । বাংলার মুখ, বাংলার রূপ আমাদের মাতৃভাষা মায়ের হাসির মতো মধুর।
চর্যাপদ থেকে বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস বিশ্বের দরবারে আজ স্বাগত। ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয় বাংলাদেশের । বাংলা ভাষা আমাদের একটি আবেগের নাম । আমাদের জাতীয়তাবাদের নাম বাংলা ভাষা। আ -মরি বাংলা ভাষা
মোদের আশা মোদের ভালোবাসা।
‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো অমর একুশে ফেব্রুয়ারি’। কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ভাষায় বলি -যদি তুমি নির্বাসন দাও ওষ্ঠে অঙ্গুরি ছোঁয়াবো
আমি বিষ পান করে মারা যাবো।
সেই ভাষা আজ অবহেলিত। সেই ভাষা আজ মুটে- মজদুর- খেটে খাওয়া মানুষের ভাষা । প্রান্তিক মানুষদের ভাষা । শ্রমজীবী মানুষের ভাষা হয়ে বেঁচে থাকে, এলিটদের ভাষা হিন্দি আর ইংলিশ। তাই আজ বাংলার অলিতে গলিতে বাংলা ছেড়ে ইংলিশ মিডিয়াম আর হিন্দি মিডিয়ামের ছড়াছড়ি। বাংলায় আজ বাংলাভাষা অবহেলিত এর থেকে লজ্জা আর দুঃখের কি আছে? বাংলা ভাষা আমার হারিয়ে যাওয়া মা। বৃদ্ধাশ্রম ছাড়া তার কোথাও স্থান নেই। এপার বাংলার এমন দশা। ওপার বাংলাতেও তাই। ধর্মের ভিত্তিতে দু’বাংলা পৃথক হয় কিন্তু ভাষার জন্যে দু’বাংলা এক হয়ে থাকে এটা তারা এখন ভুলে যায়। তারা বাংলা ভুলে উর্দু চাই বলে এখন চিৎকার করছে। তারা ধর্মের মোহে বাংলা ভুলতে চায়। তারা ভুলে গেছে তাদের ভাষা আন্দোলনের জন্যে আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। তারা জানে না তাদের জন্যে সুদূর আফ্রিকা মহাদেশের সিয়েরালিওন নামে একটি দেশের সম্মানীয় ভাষা বাংলা ভাষা । যখন সিয়েরালিওনে জাতি দাঙ্গা বাঁধে তখন সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের নেতৃত্বে বাংলাদেশের শান্তি বাহিনী সেখানে যায়। যেখানে যুদ্ধ থেমে যায় বাংলা ভাষার প্রেমে পড়ে। বাংলা ভাষার এমন জাদু ,এমন তার মহিমা। তাদের ঐতিহ্যময় গৌরব ভুলে যায় কেমন আমার বিস্ময় লাগে! নারীদের মতো বাংলাভাষা আজ সেখানে নিরাপদ নয়। তাই সেখানে আজ ‘জয় বাংলা’ বলা যায় না। তাদের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মূর্তি ভাঙচুর হয়। এখন সেখানে এক নারকীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
বাংলার মতো বাংলাভাষা এখন পৃথক হয়ে গেছে। জল আর পানি আলাদা হয়ে গেছে। তোমার ভাষা আমার ভাষা নয়। দু’,দেশের মতো বাংলা ভাষার মধ্যে ধর্মের প্রাচীর মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে।
মনে হয় বাংলা ভাষা নদীর মতো শৈবাল দামে তার গতি হারিয়ে ফেলেছে। মাকে তারা বন্দি করে রেখেছে।‌ তার বন্দি মুক্তি করার জন্যে আবার মুক্তি যুদ্ধ করতে হবে। মাকে বন্দি মুক্ত করাই আমাদের পণ হক এই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে । বাংলা ভাষা তার কৌলিন্য ফিরে পাক। কিশলয় এর মতো আমাদের মনে বাংলা ভাষার নতুন সবুজ পাতা গজাক। বসন্তের সোহাগে বাংলা ভাষা নব রূপে প্রস্ফুটিত হক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *