ভারতের জরুরি চিকিৎসায় ‘গোল্ডেন আওয়ার’-এর সুবিধা নিশ্চিত করতে যৌথ উদ্যোগ নিল ‘দ্য ই-প্লেন কোম্পানি’ ও অ্যাপোলো হসপিটালস

চেন্নাই ও নয়াদিল্লি, ২৩ জুলাই ২০২৬: ভারতে প্রতি সাড়ে ৩ মিনিটে একজন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। প্রতি বছর ভারতীয় সড়কগুলোতে ১ লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয় এবং প্রতি ৫ জন রোগীর মধ্যে মাত্র একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘গোল্ডেন আওয়ার’-এর (দুর্ঘটনার পরবর্তী প্রথম এক ঘণ্টা) মধ্যে ট্রমা কেয়ার বা বিশেষায়িত জরুরি চিকিৎসা সেবা পান। এক্ষেত্রে বেঁচে থাকার পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায় শহরের যানজট ও ভৌগোলিক দূরত্ব—চিকিৎসা দক্ষতার অভাব নয়।
এই ব্যবধান ঘোচাতে ‘উবিফ্লাই টেকনোলজিস প্রাইভেট লিমিটেড’ (যা ‘দ্য ই-প্লেন কোম্পানি’ নামে পরিচিত) এবং ‘অ্যাপোলো হসপিটালস এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড’ একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। এর আওতায় ভারতের জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় ইলেকট্রিক এয়ার অ্যাম্বুলেন্স এবং মেডিকেল ডেলিভারি ড্রোন যুক্ত করা হবে। ফলে ঘনবসতিপূর্ণ শহুরে এলাকা বা দুর্গম অঞ্চলের জরুরি রোগীরা যানজটের বিলম্ব কিংবা প্রচলিত হেলিকপ্টার স্থানান্তরের উচ্চ খরচ ছাড়াই সরাসরি প্রয়োজনীয় ট্রমা কেয়ার সেবা পাবেন।
অ্যাপোলো হসপিটালস গ্রুপের চেয়ারম্যান ড. প্রতাপ সি রেড্ডি বলেন, “সময়মতো সহায়তা না পৌঁছানোর কারণে ভারতে অনেক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। অ্যাপোলো হসপিটালসের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে—যারা ভারতে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা মডেলের সূচনা করেছিল—আমি দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বাস করি যে গভীর চিকিৎসা দক্ষতার পাশাপাশি সেবার সহজলভ্যতা বা অ্যাক্সেসই জীবন বাঁচায়। ‘দ্য ই-প্লেন কোম্পানি’-র সাথে এই যৌথ উদ্যোগটি দেশের প্রতিটি প্রান্তে—তা যতই দুর্গম হোক না কেন—অ্যাপোলোর চিকিৎসা শ্রেষ্ঠত্ব পৌঁছে দেওয়ার প্রতি আমাদের অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন।”
‘দ্য ই-প্লেন কোম্পানি’-র প্রতিষ্ঠাতা ও সিটিও (CTO) অধ্যাপক সত্য চক্রবর্তী বলেন, “যখন কারও জীবন সংকটাপন্ন থাকে, তখন প্রতিটি মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অ্যাপোলো হসপিটালসের সাথে কাজ করার ফলে আমরা খতিয়ে দেখতে পারছি কীভাবে আমাদের ইলেকট্রিক এয়ারক্রাফট ও ড্রোনগুলো দুর্ঘটনা ও চিকিৎসার মধ্যবর্তী সময়ের ব্যবধান কমাতে সাহায্য করতে পারে—বিশেষ করে সেই লক্ষ লক্ষ ভারতীয়র জন্য যারা বিশেষায়িত ট্রমা কেয়ার সুবিধা থেকে অনেক দূরে বসবাস করেন।”
‘গোল্ডেন আওয়ার’ কেন গুরুত্বপূর্ণ
ট্রমা, হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের রোগীদের ক্ষেত্রে জরুরি অবস্থার পরবর্তী প্রথম এক ঘণ্টা প্রায়শই সুস্থ হয়ে ওঠা এবং মর্মান্তিক পরিণতির মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেয়। অথচ বর্তমানে যানজট, দূরত্ব এবং বিশেষায়িত ট্রমা কেয়ারে স্থানান্তরের আগে নিকটস্থ কোনো কেন্দ্রে রোগীকে স্থিতিশীল করার প্রয়োজনীয়তার কারণে রোগীরা প্রায়শই সেই মূল্যবান সময়টুকু হারিয়ে ফেলেন। এই যৌথ উদ্যোগের লক্ষ্য হলো জরুরি পরিস্থিতি থেকে শুরু করে চূড়ান্ত চিকিৎসা সেবা পাওয়ার প্রক্রিয়াটিকে আরও দ্রুত ও সরাসরি করার মাধ্যমে বর্তমান ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা।
এক নতুন ধরনের জরুরি সেবা নেটওয়ার্ক
এই সহযোগিতার মাধ্যমে আকাশপথ ও সড়কপথের অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে:

ইলেকট্রিক এয়ার অ্যাম্বুলেন্স: ePlane-এর e200X বিমানটি দ্রুত এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে রোগী স্থানান্তর, ট্রমা বা আঘাতজনিত জরুরি অবস্থা, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের জরুরি চিকিৎসা এবং অঙ্গ পরিবহনের জন্য তৈরি করা হয়েছে। এটি সড়কপথের তুলনায় ৭ গুণ দ্রুত রোগী পরিবহন করতে সক্ষম এবং প্রথাগত হেলিকপ্টার স্থানান্তরের তুলনায় এর খরচও অনেক কম।
মেডিকেল ডেলিভারি ড্রোন: ePlane-এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ‘অ্যাম্বার উইংস’ (Amber Wings)-এর চালকবিহীন আকাশযান বা ড্রোনগুলো রক্ত ​​ও রক্তজাত উপাদান, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, টিকা, ওষুধ এবং রোগ নির্ণয়ের নমুনা বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের মধ্যে দ্রুত পরিবহনের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। এর ফলে অত্যন্ত জরুরি সামগ্রী পৌঁছানোর সময় কয়েক ঘণ্টা থেকে কমে কয়েক মিনিটে নেমে আসবে।
অ্যাপোলোর বিশাল নেটওয়ার্ক, যার মধ্যে রয়েছে ১০৬৬টি অ্যাম্বুলেন্স এবং অসংখ্য হাসপাতাল, ক্লিনিক, ফার্মেসি ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার।
উপরোক্ত বিষয়গুলোর সমন্বয়ে একটি আন্তঃসংযুক্ত জরুরি সাড়াদান ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি হচ্ছে—এমন একটি ব্যবস্থা যা ভারতের অত্যন্ত জনাকীর্ণ এবং দুর্গম শহরগুলোতেও জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দিতে সক্ষম হবে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
এই সহযোগিতার অংশ হিসেবে, অ্যাপোলো e200X এয়ার অ্যাম্বুলেন্স এবং অ্যাম্বার উইংস-এর মেডিকেল ডেলিভারি ড্রোন কেনার সম্ভাব্যতা যাচাই করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এছাড়া, শর্তাবলি নিয়ে চূড়ান্ত সমঝোতার সাপেক্ষে ভবিষ্যতে ePlane-এ অ্যাপোলোর কৌশলগত বিনিয়োগের বিষয়টিও এই সমঝোতা স্মারকে (MOU) উল্লেখ করা হয়েছে। উভয় পক্ষই এই উদ্যোগকে বাস্তবে রূপ দিতে ভারতের ‘ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ সিভিল এভিয়েশন’ (DGCA) এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে কাজ করতে আগ্রহী; পাশাপাশি এই কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিয়ে আলোচনাও অব্যাহত থাকবে।
অ্যাপোলো হসপিটালস এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড সম্পর্কে
১৯৮৩ সালে চেন্নাইতে ডা. প্রতাপ রেড্ডি যখন প্রথম হাসপাতালটি চালু করেন, তখন থেকেই অ্যাপোলো হসপিটালস এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড (AHEL) স্বাস্থ্যসেবা খাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। বর্তমানে AHEL বিশ্বের বৃহত্তম সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা প্ল্যাটফর্ম হিসেবে স্বীকৃত; তাদের নেটওয়ার্কে রয়েছে ৭৬টি হাসপাতালে ১০,৪০০-এর বেশি শয্যা, ৬,৬০০-এর বেশি ফার্মেসি, ২৬৪টি ক্লিনিক, ২,১৮২টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং ৮০০-এর বেশি টেলিমেডিসিন সেন্টার। এটি বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় কার্ডিয়াক বা হৃদরোগ চিকিৎসা কেন্দ্র, যেখানে ৩,০০,০০০-এর বেশি এনজিওপ্লাস্টি এবং ২,০০,০০০-এর বেশি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে। AHEL-এর ১,২০,০০০ সদস্যের পরিবারটি অসাধারণ সেবা প্রদান এবং পৃথিবীকে আমরা যেমনটি পেয়েছিলাম, তার চেয়ে আরও ভালো অবস্থায় রেখে যাওয়ার কাজে নিবেদিত। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *