কলকাতা: নারায়ণা আরএন ট্যাগোর হাসপাতাল ১০ বছর বয়সী এক শিশুর পেক্টাস এক্সকাভাটাম রোগের জন্য সফলভাবে পেক্টাস আপ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। এর মাধ্যমে এই হাসপাতাল নতুন ইতিহাস তৈরি করেছে—কারণ এটি ভারতের মধ্যে প্রথমবার কোনও ভারতীয় সার্জিক্যাল টিম এই উন্নত প্রযুক্তি প্রয়োগ করল, এবং উত্তর ও পূর্ব ভারতে এই প্রক্রিয়া প্রথমবার সম্পন্ন হল।

এই গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য ন্যূনতম ইনভেসিভ চেস্ট ওয়াল কারেকশন সার্জারিতে একটি নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে এবং একই সঙ্গে প্রমাণ করেছে যে ভারতেও এখন আন্তর্জাতিক মানের অত্যাধুনিক সার্জিক্যাল প্রযুক্তি সফলভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব।
শিশুটি জন্ম থেকেই পেক্টাস এক্সকাভাটামে ভুগছিল। প্রথমদিকে এটি কেবলমাত্র বাহ্যিক বা সামাজিক অস্বস্তির কারণ মনে হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি কার্যকরী সমস্যায় রূপ নেয়। তার বাবা–মায়ের মতে, ধীরে ধীরে তার বুকে অস্বস্তি ও শারীরিক পরিশ্রমের সময় শ্বাসকষ্ট বাড়তে শুরু করে।
শিশুটি ডা. মনুজেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আউটপেশেন্ট ডিপার্টমেন্ট (ওপিডি)-এ আসে এবং তার পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করা হয়। বিস্তারিত ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা ও প্রাথমিক মূল্যায়নের পর একটি বিস্তৃত ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা করা হয়, যার মধ্যে ছিল চেস্ট এক্স-রে, হ্যালারস ইনডেক্স পরিমাপসহ সিটি স্ক্যান, ইকোকার্ডিওগ্রাফি এবং পালমোনারি ফাংশন টেস্ট (PFT), যাতে রোগের জটিলতা সম্পূর্ণভাবে বোঝা যায়।
সমস্ত মূল্যায়ন ও চিকিৎসক দলের আলোচনার পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে প্রচলিত ইন্ট্রাথোরাসিক বার বসানোর নাস প্রক্রিয়া এড়িয়ে উন্নত টাইটানিয়াম ইমপ্লান্ট-ভিত্তিক পেক্টাস আপ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। এই পদ্ধতিতে বুকে হৃদ্যন্ত্র বা ফুসফুসের কাছাকাছি কোনও বার বসাতে হয় না; বরং বাহ্যিকভাবে স্টার্নামকে (বুকের হাড়) সঠিকভাবে তুলে স্থির করা হয়।
প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলা এই অস্ত্রোপচার কোনও জটিলতা ছাড়াই সম্পন্ন হয়। অপারেশনের পর শিশুটি মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই আইসিইউতে ব্যথামুক্ত অবস্থায় হাঁটাচলা করতে সক্ষম হয়। পাঁচ দিনের মধ্যেই তাকে হাসপাতাল থেকে ছুটি দেওয়া হয়।
পেক্টাস আপ পদ্ধতি পেক্টাস এক্সকাভাটাম সংশোধনের একটি নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তি। প্রচলিত নাস পদ্ধতিতে যেখানে বুকের ভেতরে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কাছাকাছি একটি ধাতব বার বসানো হয়, সেখানে পেক্টাস আপ পদ্ধতিতে বুকের হাড়কে বাহ্যিকভাবে একটি কাস্টমাইজড টাইটানিয়াম ইমপ্লান্টের মাধ্যমে তুলে স্থির করা হয়।
এই প্রক্রিয়ায় প্লুরাল ক্যাভিটিতে প্রবেশ করতে হয় না, ফুসফুস ডিফ্লেট করার প্রয়োজন হয় না এবং থোরাকোস্কোপিরও দরকার পড়ে না। ফলে অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে, অপারেশনের পর ব্যথা কম হয় এবং রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে। স্টার্নামকে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ও অ্যানাটমিকভাবে সঠিক পদ্ধতিতে তোলা হয়, যার ফলে বুকের গঠন সমানভাবে ঠিক হয় এবং বাহ্যিক ফলাফলও অত্যন্ত সন্তোষজনক হয়।
এই ক্ষেত্রে ব্যবহৃত টাইটানিয়াম ইমপ্লান্টটি ছিল সম্পূর্ণ রোগী-নির্দিষ্ট এবং এটি স্পেন থেকে আমদানি করা হয়েছিল। ইমপ্লান্টটি নিখুঁতভাবে তৈরি এবং সময়মতো পৌঁছানোর জন্য বিদেশের প্রস্তুতকারক দলের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় করা হয়েছিল। এই অস্ত্রোপচারটি সম্ভব হয়েছে ভুটানের রাজকীয় সরকারের আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে, যারা বিশেষ ইমপ্লান্টের খরচ বহনে সহায়তা করেছে।
প্রফেসর (ডা.) অমিতাভ চক্রবর্তী, সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও লিড থোরাসিক এবং ভাসকুলার সার্জারি, কলকাতা ক্লাস্টার, বলেন:
“এই সাফল্য কোনও একক সার্জনের নয়; এটি আমাদের পুরো থোরাসিক ও ভাসকুলার সার্জারি দলের সমন্বিত পরিকল্পনা ও দক্ষতার প্রতিফলন। প্রি-অপারেটিভ মূল্যায়ন থেকে অপারেশনের সময়কার নিখুঁততা এবং অপারেশন-পরবর্তী যত্ন—প্রতিটি ধাপে দলের প্রতিটি সদস্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। ভারতের প্রথম ভারতীয় টিম হিসেবে পেক্টাস আপ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং উত্তর ও পূর্ব ভারতে প্রথমবার এটি করা দেখিয়ে দেয় যে সমন্বিত দক্ষতা কত বড় সাফল্য এনে দিতে পারে। আমরা একসঙ্গে এই শিশুর জন্য একটি নিরাপদ, অ্যানাটমিকভাবে সঠিক এবং ন্যূনতম ইনভেসিভ সমাধান দিতে পেরেছি।”
ডা. মনুজেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, কনসালট্যান্ট, থোরাসিক ও ভাসকুলার সার্জারি, বলেন:
“শিশুটি যখন বুকের অস্বস্তি ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে আমার কাছে আসে, তখন আমরা বিস্তারিত পরীক্ষা করি এবং প্রচলিত ইন্ট্রাথোরাসিক বার পদ্ধতি এড়িয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। রোগীর বাবা–মায়ের সঙ্গে আলোচনা করে আমরা উন্নত টাইটানিয়াম ইমপ্লান্ট-ভিত্তিক পেক্টাস আপ পদ্ধতি বেছে নিই, যেখানে হৃদ্যন্ত্র বা ফুসফুসের কাছে কোনও বার বসাতে হয় না। এই পদ্ধতিতে অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি কমে, ব্যথা কম হয় এবং রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে। অপারেশনের মাত্র এক ঘণ্টা পর তাকে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে দেখে আমাদের সিদ্ধান্ত যে সঠিক ছিল, তা আরও একবার নিশ্চিত হয়। ভারতের প্রথম ভারতীয় সার্জিক্যাল টিম হিসেবে এই প্রযুক্তি প্রয়োগ করতে পারা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়।”
অভিজিৎ সি.পি., ডিরেক্টর ও ক্লাস্টার হেড – কলকাতা এবং কর্পোরেট গ্রোথ ইনিশিয়েটিভ, নারায়ণা হেলথ (ইস্ট), বলেন:
“ভারতে উন্নত চেস্ট ওয়াল সার্জারির ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন। উত্তর ও পূর্ব ভারতে প্রথমবার পেক্টাস আপ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং দেশের মধ্যেই ভারতীয় সার্জিক্যাল টিমের দ্বারা এই প্রযুক্তি প্রয়োগ করা আমাদের প্রতিশ্রুতিকে তুলে ধরে—যেখানে আমরা বিশ্বমানের উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি রোগীদের কাছে পৌঁছে দিতে চাই।”
আর. ভেঙ্কটেশ, গ্রুপ চিফ অপারেটিং অফিসার, নারায়ণা হেলথ, বলেন:
“নারায়ণা হেলথে আমরা মনে করি উদ্ভাবনের মূল্য তখনই আছে যখন তা রোগীর জন্য আরও নিরাপদ ফলাফল এবং দ্রুত সুস্থতা নিশ্চিত করে। ভারতে সফলভাবে পেক্টাস আপ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ায় এখন পরিবারগুলোকে আর উন্নত চেস্ট ওয়াল সার্জারির জন্য বিদেশে যেতে হবে না। এই সাফল্য আমাদের ক্লিনিক্যাল উৎকর্ষ, সহজলভ্যতা এবং আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা পরিষেবা প্রদানের অঙ্গীকারকে আরও দৃঢ় করে।”

